নবম অধ্যায়: অ্যালবামের স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে আদরের আব্দার
প্রথম মঞ্চে ফিরে আসার অনুষ্ঠান শেষ হতেই, পরবর্তী সূচি ছিল অ্যালবামের প্রথম স্বাক্ষর বিতরণী। গাড়িতে স্থানান্তরের পথে, দানিয়ান কেবলমাত্র চিজমি’র সঙ্গে আধা বাক্স লেটুস সালাদ ভাগ করে খেল। ঘুমঘোর কাটাতে, সে পেটের অস্বস্তিকে উপেক্ষা করে আধেকেরও বেশি কফি গিলে ফেলল। শেষে সে একটি কম্বল জড়িয়ে, পা কোলে নিয়ে পেছনের সিটের কোণে সঙ্কুচিত হয়ে বসল, মাথা কাঁচের জানালায় ঠেকিয়ে, চুপচাপ বাইরের দ্রুতগামী যানবাহন গুলোকে দেখতে লাগল।
মঞ্চের উজ্জ্বল আলোর নিচের তার উচ্ছ্বল চেহারার সঙ্গে এই মুহূর্তের নিঃশব্দ, বিষণ্ণ সে সম্পূর্ণ ভিন্ন। মনে হয়, যেন স্বচ্ছ কাচের প্রদর্শনী বাক্সে বন্দী, বাইরের জগতের সঙ্গে সংযোগ ছিন্ন, তার সমস্ত অস্তিত্বে একধরনের গভীর নিঃসঙ্গতার ছাপ।
সোং-ঊন চুপ থাকতে পারল না, যেতে চাইল তার কাছে, কিন্তু সিউনা হালকা জোরে হাত ধরে চোখে চোখে তাকে থামিয়ে দিল।
‘‘ওকে একা শান্ত থাকতে দাও, এটাই ওর জন্য সবচেয়ে ভালো,’’ ফিসফিসিয়ে বলল সিউনা।
সোং-ঊন দোলাচলে ঘাড় বাড়িয়ে শুধু মায়ার দৃষ্টিতে চেয়ে রইল, দানিয়ানের গাঢ় প্রসাধনের নিচেও স্পষ্ট ফ্যাকাশে চেহারার দিকে।
এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই, সিউনা এই দলে সবচেয়ে বেশি কর্তৃত্ব রাখে, এমনকি বয়সে বড় হলেও সোং-ঊন প্রায়ই তার নির্দেশ মেনে চলে।
এখনকার পরিস্থিতিতে, সোং-ঊনের দুশ্চিন্তা থাকলেও, আসলে সিউনাই সেই ব্যক্তি যে প্রশিক্ষণার্থী সময় থেকে দানিয়ানের সঙ্গে রুম ভাগ করেছে। দানিয়ানের বিষয়ে জানাশোনা, এআরআইডি-তে কোনো সদস্যই সিউনার চেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী নয়। তাই তার কথাই মানা শ্রেয়।
অন্য কেউ এভাবে বিষণ্ণ থাকলে হয়ত ম্যানেজারের সন্দেহ জাগত, কারণ সামনেই স্বাক্ষর বিতরণী, যেখানে ভক্তদের সরাসরি মুখোমুখি হতে হয়। এই মুহূর্তের ম্রিয়মাণ মনোভাব হয়ত মঞ্চের পারফরম্যান্সেও প্রভাব ফেলতে পারে।
কিন্তু সে তো দানিয়ান।
দানিয়ান কখনোই তার আত্মপ্রকাশ প্রতিযোগিতার সময় চেয়ারম্যানের মূল্যায়নকে ভুল প্রমাণ করেনি।
চেয়ারম্যান একবার পেছনের ঘরে সাক্ষাৎকারে তার প্রশংসায় কৃপণতা দেখাননি।
‘‘এই মেয়েটা তো মঞ্চের জন্যই জন্মেছে।’’
চেয়ারম্যান বিরল স্নেহশীল হাসি নিয়ে, পা ক্রসে বসে দেয়াল ঘেঁষে চলমান টিভি স্ক্রিনের দিকে আঙুল তুললেন: ‘‘মঞ্চে ওঠার আগে দানিয়ান হয়ত গম্ভীর মুখে জানিয়ে দেবে, আজ সে ভালো ফর্মে নেই। কিন্তু যখনই স্পটলাইট ঝলকে তার ওপর পড়ে, বুঝে নিতে পারো, তার কোনো সমস্যাই হবে না। এই মেয়েটা মঞ্চের খাবার খাওয়ার জন্যই জন্মেছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই, এটাই প্রতিভা। স্টারলাইন এমন ভাগ্যবান প্রতিভা নিয়ে গর্ব করতে পারে।’’
স্বাক্ষর বিতরণীতেও তাই হলো। দানিয়ান মাইক্রোফোন হাতে মঞ্চে দাঁড়িয়ে, মাথায় পড়েছিল ফাটা খরগোশ-কানের হেয়ারব্যান্ড। এর নকশা ছিল কমিক বই ‘‘আগুনে ঘুষি ফিল-খরগোশ’’-এর মূল চরিত্র দাঁত-কাটা খরগোশ ফিলনার অনুপ্রেরণা থেকে, যা সে একবার ভক্তদের সঙ্গে সরাসরি সম্প্রচারে ভাগ করে নিয়েছিল, আইডলের পরিচয়ের বাইরে তার ব্যক্তিগত পছন্দগুলোর গল্প হিসেবে।
‘‘সিউনা এবার দানিয়ানের জন্য টাস্ক তুলবে।’’
উপস্থাপক ইঙ্গিত দিলেন, সিউনা মঞ্চের মাঝখানের বাক্স থেকে একটি টাস্ক কার্ড তুলুক।
কার্ড বের করে নিজেই প্রথমে পড়ে নিল সিউনা, সঙ্গে সঙ্গে মনের ইচ্ছা পূরণ হওয়ার হাসি ফুটে উঠল মুখে।
হাসিমুখে বাহু জড়িয়ে দানিয়ানের দিকে তাকিয়ে মাইক্রোফোনে বলল, ‘‘দানিয়ান, আমাকে বেশি ধন্যবাদ দিও না।’’
‘‘বোধহয় খুব ভালো কিছু হবে না,’’ পাশে থেকে চিজমি যোগ করল।
সিউনা কার্ডের সামনের অংশ ক্যামেরার দিকে ঘুরিয়ে ধরল।
‘‘তিন রকম আদুরে ভঙ্গি।’’
‘‘দানিয়ান জানে কিভাবে করতে হয়? তিন রকম আদুরে ভঙ্গি?’’ উপস্থাপক জানতে চাইলেন।
দানিয়ান তখনো মজার হেয়ারব্যান্ড পরে, ছোট ছোট পা ফেলে সামনের দিকে এগিয়ে এল, পেছনে তাকিয়ে বাম পাশে থাকা দুই দিদির দিকে চেয়ে, কিছুটা বোকা বোকা ভঙ্গিতে গাল ছুঁয়ে কাতরাতে কাতরাতে বলল, ‘‘এভাবেই?’’
সে appena হাত তুলেই ভঙ্গি করল, নিচের ভক্তরা একসাথে চিৎকার জুড়ে দিল।
সোং-ঊন হাসি চেপে স্মরণ করিয়ে দিল, তার কথাটা মাইকে ওঠেনি।
‘‘এভাবেই? যেকোনো তিনটা আদুরে ভঙ্গি করো।’’ দানিয়ান এবার মাইকে আবার বলল।
ছোটবোন লিলিয়ান, যে সবসময় আদুরে ভঙ্গির চরিত্র ধরে রাখে, পেছন থেকে মনে করিয়ে দিল, ‘‘তিন রকম আদুরে ভঙ্গির প্রত্যেকটা যেন ক্রমে বেশি বেশি আদুরে হয়।’’
‘‘আচ্ছা, বুঝেছি,’’ আত্মবিশ্বাসী স্বরে বলল দানিয়ান, মাইক্রোফোন সিউনার হাতে দিল, সাহায্য করতে বলল।
‘‘লিলিয়ানের স্বীকৃতি পেলে তবেই পাশ, খুব আদুরে হতে হবে।’’
‘‘ঠিক আছে, সবাইকে নিরাশ করব না,’’ দানিয়ান সিউনার হাতে থাকা মাইকের কাছে মুখ এনে বলল।
সে মঞ্চের মাঝে দাঁড়িয়ে আঙুল তুলে এক দেখাল, বুঝিয়ে দিল, এটা প্রথম ভঙ্গি।
হেয়ারব্যান্ডের খরগোশ-কানের ফাটা অংশ নিচে টেনে, মাথা নিচু করে ঠোঁট ফুলিয়ে লজ্জার ভঙ্গি করল।
‘‘একটা,’’ পাশে থাকা সদস্যরা গুনে রাখল।
হেয়ারব্যান্ডের কান ছিল নরম, ফুরফুরে কাপড়ের তৈরি, সে ছাড়তেই কান দুম করে উঠে এল, আগের জায়গায় ফিরে গেল। এর সাথে সাথে দুই হাতের তর্জনি দিয়ে গালে থাকা ডিম্পলে টোকা দিল, ক্যামেরার সামনে নিখুঁত উইঙ্ক করল।
‘‘দুইটা।’’
তিন নম্বর ভঙ্গি হওয়া চাই সবচেয়ে বেশি আদুরে।
দানিয়ান কোমরে হাত দিয়ে চারপাশে দেখল, কিছু খোঁজার ভান।
যখন সে লিলিয়ানের চোখে চোখ রাখল, মুখে চওড়া হাসি ফুটে উঠল। লিলিয়ান বুঝতে পারল কিছু একটা হতে যাচ্ছে, পিছু হটা চাইল, কিন্তু পায়ে প্লাস্টার বাঁধা থাকায় সরতে পারল না।
দানিয়ান চটপটে পেছনে গিয়ে কোমর জড়িয়ে ধরল, ডান গালে চট করে চুমু খেল।
‘‘তিনটা!’’ চিজমির কণ্ঠ সহজেই চেনা যায়, প্রধান গায়িকার দক্ষতা সন্দেহাতীত।
এভাবেই এআরআইডি-র প্রতিদিনের মজার মুহূর্ত চলে। হঠাৎ চুমু খেয়ে চমকে যাওয়া লিলিয়ান মঞ্চে মাথা নিচু করে থমকে রইল। আর দানিয়ান মুখ ঢেকে এমনভাবে লজ্জা পেল, দৌড়ে মঞ্চ থেকে নেমে গিয়ে কালো মাস্ক পরা ম্যানেজার দিদির পেছনে লুকোল, ডান হাতে চুলের গোড়া ধরে বারবার হাওয়া করল লজ্জা কাটাতে। আর বাকি তিনজন মঞ্চে হাততালি দিয়ে উল্লাসে মাতল।
--------------
অবশেষে এলো অ্যালবাম স্বাক্ষর পর্ব।
দানিয়ান মিনারেল ওয়াটার বোতলের ছিপি খুলে এক চুমুক খেল।
ভক্ত তার সামনে অ্যালবাম বাড়িয়ে দিলে দানিয়ান হাসিমুখে নিল, কোমলভাবে জিজ্ঞেস করল, ‘‘কি আশীর্বাদ লিখব?’’
‘‘লিখুন, এআরআইডি-র প্রত্যাবর্তন দারুণ হোক, কিম চিন্না চাকরিতে সফল হোক।’’
‘‘কিম—চিন—না—ঠিক তো?’’ উচ্চারণে ভুল না হয় বলে দানিয়ান বারবার উচ্চারণ করল।
তার কোরিয়ান হস্তাক্ষর ছিল দারুণ ঝরঝরে, বহুদিন ধরে বইয়ের অক্ষর দেখে দেখে চর্চা করেছিল।
বিদেশী হয়েও এত সুন্দর লিখতে পারা, ম্যানেজার দিদি প্রথমবার দেখে অবাক হয়েছিল।
‘‘সব কিছু ভালো হোক, নতুন বছরেও সুস্থ থেকো।’’
প্রত্যেক ভক্তের জন্য দানিয়ান এমন আন্তরিকতা দেখাতো। এআরআইডি-র অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়ায় ভক্তরা প্রায়ই লিখত, স্বাক্ষর বিতরণীতে দানিয়ান যেসব কথা বলে, আসলে সেগুলো ওদেরই দানিয়ানকে বলা উচিত ছিল।
【অনুগ্রহ করে, এআরআইডি-র মেয়েরা অবশ্যই নিরাপদ ও সুস্থ থাকবে, এটাই সবচেয়ে জরুরি।】
【চাই, ঘুম থেকে উঠে ফোন হাতে নিয়েই যেন তোমাদের উজ্জ্বল হাসিমুখ মঞ্চে দেখতে পাই, এজন্য পরিবার কনসার্টের ফটো ওয়ালপেপার বানিয়ে রেখেছি। কথা দাও, এভাবেই হাসিমুখে এগিয়ে যাবে।】
【ঘাম আর চোখের জল মিশিয়ে আত্মপ্রকাশ পাওয়া এআরআইডি, পৃথিবীর অমূল্য ধন। চূড়ান্ত সাফল্য পর্যন্ত সবসময় পাশে থাকব।】