অষ্টাদশ অধ্যায়: ভূত মামা
ঢুলু ঢুলু ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে যেন হঠাৎই শৈশবে ফিরে গিয়েছি—ওই পাহাড়, ওই নদী, ওই পথ, গ্রাম থেকে গ্রাম পেরিয়ে চলা স্মৃতি, যেন তেমন কোনো পরিবর্তনই হয়নি। সময়ের সবচেয়ে বড় কাজ, বোধহয় মানুষের মনটাই বদলে দেওয়া।
নানু বললেন, এবার যে 'ভূত মামা'কে খুঁজতে আসা, সে-ই সেই বছর জোম্বি থেকে জন্ম নেওয়া ভূতের শিশু, এখন তো সে-ও আধবুড়ো হয়ে গেছে। তখন তার বাবা, চতুর্থ ঝাও, আবার বিয়ে করেছিলেন, কন্যাসন্তান হয়েছিল, সেই মেয়ে আবার সন্তানের মা হয়েছে। গ্রামে লোকে ছেলেমেয়েদের নিয়ে ঠাট্টা করত—তোমার ভূত মামা কেমন কেমন, এভাবে নামটাই হয়ে গেল।
আধঘণ্টার মতো পর, গাড়ি একটা গ্রামের মুখে থামল। নেমে দেখি, গেটের পাশে একফালি উঁচু-নিচু মাটির ঘর, জানালায় ছেঁড়া প্লাস্টিক শীতল বাতাস ঠেকাতে পারছে না, কাঁপতে কাঁপতে শোকে যেন আকাশের কাছে নালিশ জানাচ্ছে।
নানু দু-একবার ডাকলেন, সাড়া নেই। কাছে গিয়ে দেখলাম, দরজা আধা খোলা, ভিতরে উঁকি দিয়ে দেখি, কেউ নেই।
‘‘দেখছি বেশি দূরে যায়নি, হয়তো একটু অপেক্ষা করি,’’ চতুর্থ মামা বললেন।
‘‘কীভাবে বুঝলে দূরে যায়নি?’’
চতুর্থ মামা দরজার দিকে ইশারা করলেন, ‘‘দরজা খোলা, মানুষ কি দূরে যাবে নাকি?’’
নানু ঘরের চারপাশে পায়চারি করলেন, ধীরে ধীরে বললেন, ‘‘তাকে দরজা লাগানোর কী দরকার? চোরের ভয়?’’
মামা চুপ করে গেলেন।
আমি এগিয়ে গিয়ে ঘরের ভেতরটা ভালো করে দেখলাম—একটা কাদার খাটে উল্টোপাল্টা ছড়ানো বিছানা-চাদর, একটা মোটামুটি ভালো টেবিল, কোণে কিছু ভাঙা কৃষি-সরঞ্জাম, আর একটা বড় বাক্স বেশ গোছানো, এর বাইরে আর কিছু নেই। এই ঘরে চুরি করার মতো কিছু নেই, বরং ফেলে রাখলেও কুড়িয়ে নেবে না কেউ।
এমন সময় ‘‘টিং টিং’’ করে মোটরসাইকেলের হর্ন, পেছনে তাকিয়ে দেখি, রাস্তার ধারে মোটরসাইকেল থামল, নামল দুইজন। সামনের জন মধ্যবয়সী, ছোট চোখ, বড় থুতনি, লম্বা, চওড়া গলা, চিৎকার করে বলল, ‘‘ওই কী, ওটা তো ঝাং দাদু? আর চার ভাই? অনেকদিন দেখা নেই, এতদিন পর এলেন, কী ব্যাপার, ঝাও দাদা আছে?’’
‘‘ঠিকই ধরেছো, লি-মহাশয়। ঝাও কেন বাড়িতে নেই?’’
লি-মহাশয় হাত নেড়ে বললেন, ‘‘কী মহাশয় মহাশয় বলছেন, আমাকে লজ্জা দিচ্ছেন। আমি তো লি ইরচু, কৃতজ্ঞতা ভুলব কেন। গ্রামে খাল খোঁড়া হচ্ছে, সবাই পশ্চিমের ধানক্ষেতে কাজ করছে, কিছু দরকার?’’
নানু হেসে বললেন, ‘‘তা হবে না, এখন তো আপনি গ্রামপ্রধান, ইচ্ছেমতো ডাকতে পারি না। আসলে একটু দরকারই আছে, আপনি ব্যস্ত না থাকলে আমাদের ওনার কাছে নিয়ে যেতে পারেন?’’
‘‘কোনো কথা নেই, আমিও যাচ্ছি ধানক্ষেতে পানি-তোলার যন্ত্র নিতে, চলুন একসাথে যাই...’’
বাক্য শেষ হওয়ার আগেই লি-মহাশয় আমাকে চোখে পড়লেন, চমকে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘‘ঝাং দাদু, এটা তো আপনার বড় নাতি, তখন আপনার বাড়িতে দেখেছিলাম, একদম চিনে ফেললাম, দেখুন কত বড় হয়েছে, পাঁচ-ছ’ বছর তো দেখা হয়নি? শহরের ছেলের মতো চেহারা, বেশ বেরিয়েছে...’’
আমার তো মনে হচ্ছিল নাক বেঁকে গেল—এমন কথা বলা লোক কীভাবে গ্রামপ্রধান হয়! এটা কি প্রশংসা, না অপমান?
নানু হেসে বললেন, ‘‘এ তোমার লি-কাকা, ছোটবেলায় নিশ্চয়ই দেখেছো।’’
আমার একটু মনে পড়ল, তাই ভদ্রভাবে ‘‘লি-কাকা’’ বলে ডাকলাম।
লি-মহাশয় হেসে বললেন, হঠাৎ মনে পড়ল কিছু, পেছন থেকে এক ছেলেকে টেনে বের করলেন, আমার বয়সীই হবে, লম্বা, কিছুটা আনমনা, খুবই রোগা, যেন ডাঁটা শাক।
‘‘ঝাং দাদু, এ আমার বড় ছেলে, মনে আছে? তখন সে... হা হা, এখন নাম লি শিংওয়েন, স্কুলে শিক্ষক রেখেছিল। ছেলে, এ তো তোমার সেই ঝাং দাদু, ও পাশে তোমার দাদা, আর ওজনেই চতুর্থ মামা, কি করছো, তাড়াতাড়ি ডাকো!’’
লি-মহাশয় ছেলেকে ধমক দিলেন, সে ঘাড় সঁকিয়ে বাবার দিকে তাকাল, বুঝতে পেরে ‘আ’ করে ডেকে আমাদের দিকে তাকাল।
ছেলেটা এক মুখে ডেকে উঠল, ‘‘ঝাং দাদু, দাদা, চতুর্থ মামা।’’ বেশ ভদ্রই বটে।
লি-মহাশয় হালকা দুঃখের সুরে বললেন, ‘‘দেখুন, ঝাং দাদু, ওই বছর থেকে এমনই, একটু বোকা বোকা, তবে আপনার দয়াতেই আজ এতটুকু আছে।’’
বাবার কথা শুনে ছেলেটা—লি শিংওয়েন—বোকা বোকা হেসে আমার দিকে বারবার তাকাতে লাগল, সত্যিই যেন একটু খামতি আছে মাথায়।
আমি নানুর দিকে তাকালাম, ইঙ্গিত দিলাম সময় নষ্ট না করতে, নানু বুঝলেন, লি-মহাশয়কে বললেন, ‘‘তা, ইরচু, চলো, দেরি না করি, ক্ষেতে তো সবাই অপেক্ষা করছে পানি-তোলার জন্য...’’
লি-মহাশয় মাথায় হাত দিয়ে বললেন, ‘‘ঠিক, তাড়াতাড়ি চলি, আপনি মোটরসাইকেলে উঠতে না চাইলে ঠিক আছে, আমি সামনে থাকব, আস্তে চালাব, পেছনে আপনারা আসবেন। পুরো গ্রাম অপেক্ষায়, আগেরটা মাত্র দুই বছরেই নষ্ট, সারানো যায়নি, এবার নতুন কিনে এনেছি, এখনকার জিনিসের মান আগের মতো নেই, যেমন গত বছর কিনেছিলাম ওয়াশিং মেশিন...’’
তার এমন বকবক সহ্য করতে না পেরে বললাম, ‘‘লি-কাকা, চলুন, না হলে ক্ষেতে বিলম্ব হবে।’’
‘‘ঠিক আছে, চলুন চলুন।’’
লি-মহাশয় মোটরসাইকেল চালিয়ে ছেলে নিয়ে এগোলেন, আমি আর নানু ঘোড়ার গাড়িতে চেপে পেছনে চললাম।
একটানা বকবক শুনতে শুনতে অবশেষে দূর থেকে ধানক্ষেত দেখা গেল, নানু লি-মহাশয়ের কথা কেটে ছোট声ে কিছু বললেন, তিনি অবাক হলেন, কিছু জিজ্ঞেস করলেন, চুপচাপ সম্মতি জানালেন, তারপর দ্রুত ধানক্ষেতে চলে গেলেন।
আমাদের গাড়ি রাস্তার পাশে দাঁড়াল, কিছুক্ষণ পর এক ছায়ামূর্তি ধীরে ধীরে এগিয়ে এল, নানু চুপিসারে বললেন, ‘‘দেখলে, এ-ই হচ্ছে ভূত মামা।’’
কেন জানি, ওকে দেখেই দেহে কিছু অদ্ভুত অনুভূতি হল।
একেবারে গ্রামের সাধারণ পোশাকের ছোটখাটো বুড়ো, বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি, খাটো, গোড়ালি গুটিয়ে খালি পায়ে মাটিতে হাঁটে, পরনে মলিন পুরনো শর্ট, হাঁটতে হাঁটতে হাতে লেগে থাকা কাদা ঘষে, ভালো করে দেখে দেখি, মুখে শঠতার ছাপ, কপাল উঁচু, দেখতে যেন ছোটখাটো কোনো লোকঠাকুর...
এ লোকটার মুখ দেখে একেবারে অবাক হয়ে গেলাম—এ তো গতরাতের সেই ভূতের কর্মচারীর মতো!
আমি অবাক হয়ে ওর দিকে চুপচাপ তাকিয়ে থাকলাম, লোকটা নানুকে চিনল মনে হয়, কাছে আসার আগেই কোমর বেঁকিয়ে বলল, ‘‘ঝাং দাদু এসেছেন, আমার এই অবস্থা নেবেন না, লি ভাই বলল আপনি খোঁজ করছেন কেন?’’
বলতে বলতে, কাদা মাখা হাত জামায় মুছে নিল, জামাটা এমনিতেই মলিন, আরও রঙিন হয়ে গেল।
নানু হেসে বললেন, ‘‘ঝাও ভাই, সাত-আট বছর তো হয়ে গেছে, ভালো আছো?’’
‘‘ভাই বলবেন না, আপনার সামনে আমি ছোট, বড় নামেই ডাকুন, ছোট নামেও চলবে, এখন তো আর যা হোক দিন কাটে, ভালো-মন্দ মেশানোই। কিছু জানার থাকলে বলুন, যত পারি করি...’’ লোকটা নানুর সামনে একটু সঙ্কুচিত, কথা বলতেও সাবধানে।
‘‘আচ্ছা, তাহলে ঝাও ইয়াংইয়াং, একটা কাজ তোমাকে ছাড়া হবে না,’’ নানু ভেবে বললেন।
কি! ঝাও ইয়াংইয়াং? পাশে দাঁড়িয়ে হাসি চাপতে পারলাম না—এ কেমন নাম! সময়ের বিচারে তখনও বেশ আধুনিক নাম, তবে আধবুড়োর গায়ে গেলেই কেমন যেন...
ছোটবুড়োটা কিছু মনে করল না, আমায় হাসতে দেখে চোখ কুঁচকে হেসে ফেলল, কোথাও ভূতের ছায়া নেই, আমার সংশয় দূর হল, বোধহয় সত্যিই একই রকম চেহারার কেউ কেউ হয়, কিংবা, সেই ভূতের কর্মচারী এদের বংশের কেউ? বংশগত বৈশিষ্ট্য?
নানু একটু লজ্জা পেয়ে বললেন, ‘‘তা... ঝাও ভাই বলেই ডাকি, ব্যাপারটা বলতে গেলে অনেক কিছু বলা লাগে...’’
তারপর নানু সব খুলে বললেন, শেষে বললেন, ‘‘তোমার মা আবার বেঁচে উঠেছে, এখন মানুষকে ছায়া করে বেড়াচ্ছে, কী করবে বলো?’’
ঝাও ইয়াংইয়াং ভাই একেবারে স্তব্ধ, মাথা যেন কাজ করছিল না, খানিক দাঁড়িয়ে হঠাৎ কাঁপতে কাঁপতে নানুর পায়ে পড়ে গেল।
‘‘ঝাং দাদু, একটা উপায় বলুন, আপনার যা বলেন তাই করব...’’
নানু তাড়াতাড়ি তাকে তুলে বললেন, ‘‘উঠো উঠো, তোমার বয়স হয়েছে, এসব মানায় না। উপায় অবশ্যই আছে, তবে তোমার আমার নাতিকে নিয়ে শহরে যেতে হবে।’’
‘‘ঠিক আছে, ঠিক আছে।’’
ঝাও ইয়াংইয়াং বারবার সায় দিল, করুণ চোখে আমার দিকে তাকাল।
গ্রামের মুখে, বুড়োটা জিনিসপত্র গোছাতে ব্যস্ত, আমি নানুকে চুপিসারে জিজ্ঞেস করলাম, ওর এ নাম কেন?
নানু হেসে বললেন, ‘‘ওর ভাগ্যে ছায়া বেশী, পবিত্রতা কম, তখন ওর বাবা শুনেছিলেন, নাম শক্তিশালী রাখলে ছায়া কমবে। ওর বাবা লেখাপড়া জানতেন না, নাম রাখারও জানতেন না, আবার পয়সা খরচ করে গুরু ডাকবেন সেটাও চাননি, তাই ভাবলেন, বেশি পবিত্রতা চাইলে নামেই রাখি ঝাও ইয়াং, পরে ভাবলেন, একটা কম, দুটো রাখি—ঝাও ইয়াংইয়াং। সবাই অদ্ভুত মনে করলেও আর কেউ কিছু বলেনি। তবে আমার মতে, ও তো জন্ম থেকেই ছায়ার শরীর, যতই নাম পাল্টাও লাভ নেই, অর্ধরাতে কবরঘরে ঘোরে, ভূতও ওকে খোঁজে না, আপনজন মনে করে...’’
সবটা পরিষ্কার, বুঝলাম ওকে দেখলে কেন অস্বস্তি লাগে, আমার অলৌকিক চোখ সরাসরি ওকে ভূত ভেবেছে।
‘‘নানু, আমি তো ছায়া শরীরেরই?’’
নানু একবার তাকিয়ে হেসে বললেন, ‘‘ওর কাছে তুই কিছুই না। ও যদি হয় পাকানো কুমড়ো, তুই তো কেবল এক টুকরো ভুট্টার দানা...’’