অধ্যায় ২৭—মুক পরিবার কুইন পরিবারের সন্ধ্যা অনুষ্ঠানে বিশাল হাঙ্গামা (প্রথম পর্ব)
মুখরান দু’হাত দিয়ে কাঁধে ঝুলে থাকা স্যুটের কোটটা ধরে খেলাচ্ছলে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চুলোচুলি জুটির দিকে তাকিয়ে রইল। তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল; আনলান এখনো স্বীকার করছে না যে তার আর মিলান্সের মধ্যে কিছুই নেই।
মুখরানের কাছে বরং মনে হচ্ছে এই দু’জন বেশ মানানসই—একজন মিশ্রজাতের ডিজাইনার, আরেকজন দাম্ভিক ধনীর কন্যা।
আনলান নিজের গালে হাত রেখে, যেখানে কিছুক্ষণ আগে ওই পুরুষটি চুমু খেয়েছিল, বিরক্ত হয়ে মুখ মুছল আর তাড়াতাড়ি পেছনে থাকা মুখরানকে বলল, ‘‘মুখরান! ভুল বুঝো না, আমি কখনোই এই ছেলেটাকে পছন্দ করি না!’’
আনলানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মিলান্স হতাশ হয়ে বুক চেপে ধরল, মুখে আড়ম্বরপূর্ণ কষ্টের ছাপ, ‘‘লানলান, আমার কী দোষ, যে তুমি আমাদের সম্পর্ক এভাবে অস্বীকার করছ?’’
আনলান রাগে মিলান্সের গায়ে ধাক্কা দিল, মুখরানকে ধরে নিয়ে ক্রুজের ভেতরে ঢুকে পড়ল। আমন্ত্রণপত্র দেখানোর সময়ও সে মুখরানের কাঁধ থেকে স্যুটের কোটটা টেনে নামিয়ে পেছনে থাকা মিলান্সের দিকে ছুঁড়ে দিল, ‘‘তোমার কোটটা নিয়ে যাও, এত তীব্র পারফিউমের গন্ধ, অসহ্য।’’
মিলান্সের গভীর দৃষ্টিতে হাসির রেখা আরও বেড়ে গেল, সে যেন আনলানের বিরক্তি সহ্য করেও তৃপ্ত।
‘‘একেবারে দুরন্ত ছোট্ট বাঘিনী।’’
আনলান অন্য নারীদের মতো নয়, তার স্বভাব বেশ বুনো। মিলান্স অসংখ্য নারী দেখেছে, কিন্তু আনলানের মতো এমন চঞ্চল অথচ আকর্ষণীয় মেয়ে সে আর দেখেনি।
আর ওই মুখরান মিস, তার চেহারা আর গড়ন মিলান্সের বেশ পছন্দ, কিন্তু স্বভাবটা... অত্যন্ত শীতল, স্পষ্টতই দূরত্ব বজায় রাখে।
‘‘মিলান্স, কী ভাবছ?’’ আনলান দেখল মিলান্স প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে আছে, লম্বা শরীরটা নিয়ে যেন গভীর চিন্তায়।
মিলান্স ভদ্রভাবে হাত নেড়ে ওর দিকে এগিয়ে এল।
‘‘এই, মিলান্স! সত্যিই অনেকদিন পরে দেখা!’’ অদ্ভুত আকর্ষণীয় গড়নের, তীক্ষ্ণ মুখাবয়বের, রাজকুমারীর মতো চুল কাটা এক নারী হাসিমুখে তিনজনের দিকে এগিয়ে এল।
‘‘হাই! আমার লাকি ছোট্ট বন্ধু, সত্যিই অনেকদিন পরে দেখা!’’
মুখরান আর আনলান একসাথে মাথা তুলে ওর মুখের দিকে তাকাল, মেয়েটির উচ্চতার চাপে নিজেরাই মাথা নিচু করে ফেলল।
‘‘ভাগ্যও কতটা অন্যায়! দারুণ গড়ন থাকাই যথেষ্ট ছিল, তার ওপর দেখতে এমন সুন্দর।’’
আনলান খুবই প্রাণবন্ত, অন্য কাউকে প্রশংসা করতে কুণ্ঠা নেই।
মিলান্সের কাঁধে চাপড় মারল লম্বা মেয়েটি, তারপর নিচু হয়ে মুখরানদের দিকে তাকাল, চিকন চোখ দুটো ভ্রুর শেষপ্রান্তে হালকা বাঁক নিয়ে উঠল, ‘‘তোমাদের প্রশংসার জন্য ধন্যবাদ, তোমরা দু’জন খুবই মিষ্টি।’’
মুখরান: ‘‘...’’
আনলান: ‘‘...’’
তাদের মনে হল এই নারী যেন তাদের অপমান করল, বিশেষ করে এই লাকি নামের মেয়েটির দৃষ্টিতে যেন তারা ছোট্ট মুরগির ছানার মতো।
মুখরান ঠোঁট টিপে হাসল, ‘‘তোমরা দুজন গল্প করো, আমি আর আনলান আর বিরক্ত করব না।’’
লাকি গভীরভাবে মুখরানের দিকে তাকাল, হাত বাড়িয়ে ওর ছোট মাথায় হাত রাখার চেষ্টা করল।
‘‘মিস লা, আপনি কী করতে চাচ্ছেন?’’ মুখরান সতর্ক হয়ে সরে গেল, শীতল চোখে লাকির খেলাচ্ছল দৃষ্টি লক্ষ্য করল।
‘‘কী মিস লা! ও হচ্ছে আমার দেখা সবচেয়ে অসাধারণ মডেল—লাকি। লাকি, আর দুষ্টুমি নয়, আমরা ওদিকে গিয়ে ভদকা খাই।’’
যাওয়ার আগে, লাকি মুখরানের দিকে একরাশ কৌতুকপূর্ণ হাসি ছুড়ে দিল।
‘‘আমি কেন যেন মনে হচ্ছে মেয়েটিকে আগে কোথাও দেখেছি?’’ মুখরান লাকির পেছন ফিরে যাওয়া দেখে চাপা স্বরে বলল।
আনলান একটু অবাক হয়ে থাকা মুখরানকে খোঁচা দিল, ‘‘কী দেখে মনে হলো? ও তো এই সময়ের সবচেয়ে বেশি ব্র্যান্ডের মুখ, যদি ১৮৮ সেন্টিমিটার উচ্চতা আর অত লম্বা না হতো, শুধু ওই মুখশ্রী নিয়ে অভিনয় জগতে অনায়াসে চলে যেতে পারত।’’
‘‘প্রিয়, আমাদের মন ভালো রাখতে হবে, হিংসে করার দরকার নেই, তুমিও খুব সুন্দর।’’
আনলানের সান্ত্বনায় মুখরান হেসে উঠল, ‘‘লানলান, আমার মন খুব বড়, আমি হিংসে করি না, আমি শুধু ওই সুন্দরীকে নিয়ে কৌতূহলী।’’
‘‘তাই তো হওয়া উচিত, আমাদের হিংসুটে হলে চলবে না, নিজেকে নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে।’’
আনলান বিনোদন জগতের মেয়েদের পারস্পরিক বিদ্বেষ একেবারেই অপছন্দ করে, ম্যানেজার পেশা বেছে নেওয়ার দিন থেকেই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সবচেয়ে বিশুদ্ধ আর যোগ্য শিল্পী গড়ে তুলবে।
মুখরানই তার সেরা, একমাত্র পছন্দ।
আনলান মুখরানকে নিয়ে ক্রুজের দ্বিতীয় তলায় গেল, যেখানে সন্ধ্যার আসর বসছে।
তারা একটু দেরিতে পৌঁছেছিল, তাই প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই সকলের দৃষ্টি তাদের দিকেই গেল।
‘‘উফ, এখন তো সত্যিই আমরা সবার নজর কাড়ছি, ছোট মুখরান, কী করি? সবাই আমাদের দেখছে, আমার ভয় করছে!’’
আনলান চুপিচুপি ঠান্ডা স্বভাবের মুখরানের দিকে তাকাল, ওর হাত ধরে নড়ল।
‘‘এমন অনুষ্ঠানে তো তুমি ছোটবেলা থেকেই যাচ্ছ, এবার হঠাৎ অস্বস্তি লাগছে কেন?’’ মুখরান বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল।
‘‘আসলে আমি পার্টিতে যেতে পছন্দ করি না, এই পরিবেশও ভালো লাগে না। কেবল কুইন পরিবারের আয়োজক বলে এসেছি, তা-ও দেখি সবাই এত আগে চলে এসেছে!’’
আনলান মুখরানকে নিয়ে খাবারের টেবিলের দিকে এগোল; উঁচু শ্রেণির পার্টিতে তো আসলে কেউ খেতে আসে না, তাই ওখানে লোকজন কম।
পার্টিতে সবাই মুখে হাসি ধরে বিনয়ের সঙ্গে কথাবার্তা বলছিল।
মুখরানের মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য, শীতল ব্যক্তিত্ব, সঙ্গে দামি উচ্চমানের গাউন, সব মিলিয়ে ধনী তরুণদের চোখ তার দিকেই ঘুরছিল।
তার ওপর, মুখরান আর সম্রাজ্ঞী শহরের বিখ্যাত নৌপরিবারের কন্যা আনলানের ঘনিষ্ঠতা—এতে অনেকেই মুখরানকে নিয়ে কৌতূহলী হয়ে ওঠে।
‘‘আন পরিবারের কন্যার পাশে মেয়েটা কোন পরিবারের? আগে তো দেখিনি!’’
‘‘দেখতে বেশ মিষ্টিই তো!’’
‘‘ওই মেয়েটা কে! কত রঙিন পোশাক, মনে হয় ছেলেদের আকৃষ্ট করতেই এসেছে!’’
‘‘চুপ করো, সে既 আন পরিবারের কন্যার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখে, তাহলে তার পরিচয় সহজ নয়!’’
‘‘আন কন্যার পাশে মেয়েটা এত চেনা চেনা লাগছে কেন? কোথায় যেন দেখেছি।’’
ফংসি তার স্বামী কিন শিউনের সঙ্গে অতিথিদের মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। কিছুজনের দৃষ্টি একসঙ্গে একদিকে ঘুরতে দেখে কৌতূহলী হয়ে তাকাল, খাবারের টেবিলের পাশে দুই তরুণীকে দেখে খানিক থমকে গেল, কপাল কুঁচকে উঠল—ও তো আজকের সেই মুখরান, যাকে বিউটি পার্লারে দেখা হয়েছিল!
সে তো বলেছিল আজ আসতে পারবে না, তবে কী সে কোনো বড় পরিবারের মেয়ে? কিন্তু কখনো তো ওকে দেখেনি।
কিন শিউন লক্ষ করল, তার স্ত্রী মদের গ্লাস হাতে কপাল কুঁচকে কিছুটা অস্বস্তিতে আছে। সে আস্তে করে স্ত্রীর পিঠে হাত রাখল, কোমল গলায় বলল, ‘‘ফং, শরীর খারাপ লাগছে? বিশ্রাম নাও, আমি পারব, এই পার্টি এমনিতেও তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়।’’
ফংসি নিজেকে সামলে নিল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সুদর্শন ভদ্রলোক স্বামীকে মাথা নেড়ে বলল, ‘‘কিছু হয়নি, আজ বড় ছেলের জন্মদিন, আমি অনুপস্থিত থাকতে পারি না।’’
‘‘উঁহু, কিসের বড় ছেলে! সে তো আমার দুর্ভাগ্য, না হলে আমার রানরান হারিয়ে যেত না!’’
‘বড় ছেলে’ কথাটা শুনে কিন শিউন রেগে উঠল, মুখে ক্ষোভ।
ফংসির দৃষ্টিতে দুঃখ ঝরে পড়ল, সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘‘রানরানের কথা আর তুলো না, ইচেন তো তখন ভাবতেই পারেনি ওর বোন হারিয়ে যাবে, সেও খুব অনুতপ্ত, ওকে দোষ দিও না।’’
‘‘হুম! অযোগ্য ছেলে!’’
‘ইচেন’ নাম শুনলেই কিন শিউনের মাথা গরম হয়ে যায়, তার বড় ছেলে একেবারে নিজের মতো জেদি, বছরে একবারও বাড়ি ফেরে না।
‘‘তুমি আর রাগ কোরো না, কত কষ্টে বড় ছেলের জন্য জন্মদিনের পার্টি দিচ্ছি, ইচেন এলে মুখ গোমড়া করে থেকো না—শুনলে? না হলে আমি কথা বলব না!’’
‘‘ঠিক আছে, ঠিক আছে, সব তোমার ইচ্ছেমতো হবে। এসো, আগে একটু বসি, ইচেন আসুক, তারপর দেখা যাবে।’’
কিন শিউন স্ত্রীকে খুব ভালোবাসত। এত বছর ধরে ছোট মেয়ে রানরানের জন্য ফংসির চোখের জল শুকিয়ে গেছে।