পঞ্চম অধ্যায় তদন্ত এবং অনুসন্ধান

ভীতিকর মৃত্যুর খেলা ই শ্যান ই 2113শব্দ 2026-02-09 14:25:12

বাবা-মা বাড়িতে নেই, আমি অনেক ভেবে শেষ পর্যন্ত ঠিক করলাম এই ‘ভূতের রাজা’ সম্পর্কে আগে একটু খোঁজ নেওয়া দরকার।毕竟 কে-ই বা চায় আবার সেই সব আজব ভয়ঙ্কর খেলা খেলতে! আমি কম্পিউটারটা অন করলাম, ব্রাউজারে এদিক-ওদিক ঘাঁটাঘাঁটি করতে লাগলাম, মাথার মধ্যে শুধু একটাই চিন্তা—ভূতের রাজা! প্রায় আধঘণ্টা খুঁজলাম, কিন্তু বেশিরভাগই ছিল উপন্যাস কিংবা সিনেমা নিয়ে।

হাল ছেড়ে দেওয়ার আগমুহূর্তে হঠাৎই এক অদ্ভুত পোস্ট চোখে পড়ল। পোস্টদাতা লিখেছেন, ‘‘ভূতের রাজা আবার মর্ত্যে ফিরেছে, মানুষের জগতে শুরু হবে বিপর্যয়।’’ আমি একটু নিচে নেমে মন্তব্যগুলো পড়তে লাগলাম। কেউ লিখেছে, ‘‘আগুনের চিমনি, দ্রুত বিখ্যাত হও!’’ আরেকজন লিখেছে, ‘‘লেখক, দয়া করে অন্য গল্প লেখো, এটা জনপ্রিয় হবে না...’’

তবুও আমি হাল ছাড়িনি, পোস্টদাতাকে একটা বার্তা পাঠালাম—‘‘আপনি কি ভূতের রাজা সম্পর্কে কিছু বলতে পারেন? জানতে চাইছি।’’

অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও কোনো উত্তর পেলাম না, তাই কম্পিউটারটা বন্ধ করে দিলাম। জানালার বাইরে পড়ন্ত সূর্যরশ্মির দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলাম শুধু সেই অভিশপ্ত ভয়ের খেলা নিয়ে নয়, বাবা-মাকে নিয়েও। গত ক’দিন আমি বাবা-মাকে ফোন দিয়েছিলাম, দুর্ভাগ্যবশত কেউই ধরেনি।

পেটের ভেতর থেকে গরগর শব্দ আসতেই মনে পড়ল, আজ সারাদিন কিছুই খাওয়া হয়নি। কাপড় বদলে, সন্ধ্যার হালকা বাতাসে শহরের রাস্তায় উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে লাগলাম। ভাগ্যিস বাবা-মা যাওয়ার সময় পকেটে পাঁচ হাজার টাকা গুঁজে দিয়েছিলেন, নাহলে জানতামই না কিভাবে বাঁচব।

হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম এক ফাঁকা পার্কে। সদ্য কেনা চপ হাতে নিয়ে পার্কের বেঞ্চে বসলাম। খেতে খেতে টেরই পেলাম না, পাশে কখন একজন এসে বসেছে। চোরা চোখে তাকাতেই দেখি, এক বৃদ্ধ, হাতে লম্বা পাইপ, যেন স্বর্গের সুখে আছেন।

কেন জানি, এই বৃদ্ধকে দেখলেই আমার প্রয়াত দাদুর কথা মনে পড়ে যায়। দাদুর বাড়ি ছিল পাহাড়ে, ঠাকুমা আমার জন্মের আগেই মারা গিয়েছিলেন, আর দাদুর সবচেয়ে প্রিয় ছিল ধূমপান করা...

একটু স্মৃতি হাতড়ে উঠে দাঁড়ালাম, বাড়ি ফেরার জন্য।

‘‘বাবা, তোমার গায়ে অশুদ্ধ কিছু আছে,’’ হঠাৎ বৃদ্ধ এমন কথা বললেন যে, মনে মনে ভাবলাম, ‘‘অশুদ্ধ? আমি তো স্নান করে এসেছি!’’

ভাব করলাম কিছুই শুনিনি, পার্কের ফটকের দিকে হাঁটতে লাগলাম।

‘‘বাবা, ভয়কে মুখোমুখি হতে হবে...’’ বৃদ্ধ আবারও বললেন। ফিরে তাকাতেই দেখি তিনি ইতিমধ্যেই পার্কের ভেতরে ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছেন।

বুঝিনি কথার মানে, ভাবলাম বৃদ্ধ হয়তো একটু অদ্ভুত কিংবা বিভ্রান্ত।

রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে অনেক দিন পরে একটু নিশ্চিন্ত সময় কাটালাম। শহরের রাতের দৃশ্য, প্রেমিক যুগল, রাতভর পানশালার উন্মাদনা—সব দেখে মনে হচ্ছিল এখানে আমার কোনো জায়গা নেই, বড়ই অচেনা লাগছিল চারপাশ।

কিছুক্ষণ পর বাড়ি পৌঁছে প্রথমেই কম্পিউটারটা চালালাম, কিন্তু পোস্টদাতা তখনও উত্তর দেয়নি।

হতাশ হয়ে বিছানায় শুয়ে গত ক’দিনের ঘটনা আবার ভাবতে লাগলাম। ভাবার কিছুই নেই আসলে—ভূতের রাজা নামে এক অজানা মানুষ হঠাৎ হাজির হয়েছে, আর সে একের পর এক খুন করছে।

ঠিক তখনই একটা ফোন আমাকে বাস্তবে টেনে আনল।

‘‘হ্যালো, কে বলছেন?’’

‘‘আমি, চেন চেন,’’ এক গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল। না বললেও আমি বুঝতে পারতাম।

‘‘কি ব্যাপার?’’

‘‘কিছু সূত্র পেয়েছি, আসতে চাও?’’ চেন চেন আজ বেশ সিরিয়াস, কথায় যেন দৃঢ়তা।

‘‘অবশ্যই চাই, লোকেশন পাঠিয়ে দাও,’’ বলে ফোন কেটে দিলাম।

এখন রাত প্রায় সাড়ে সাতটা, চারপাশে অন্ধকার ঘনাচ্ছে। আমি কালো জামা-প্যান্ট পরে আয়নায় দাঁড়িয়ে একটু বাহাদুরি দেখালাম।

চেন চেন পাঠানো ঠিকানায় পৌঁছাতে এক ট্যাক্সি ডেকে উঠলাম।

‘‘ভাই, এত রাতে আনশান মন্দিরে যাচ্ছো কেন?’’—ড্রাইভার ভেবেছে আমি হয়তো ভাড়া দিতে পারব না।

আমি একশো টাকার নোট ছুড়ে দিয়ে বললাম, ‘‘বন্ধুর কাছে যাচ্ছি।’’

টাকার ঝলকে ড্রাইভারের চোখ চকচক করে উঠল, চুপিচুপি টাকাটা রেখে দিলেন।

‘‘ভাই, সাবধানে থেকো, শুনেছি ওখানে রাতে যাওয়া ঠিক নয়...’’ ড্রাইভার যেন কথার ফোয়ারা, মুখে ফেনা তুলছে; তবে ভালোই, আমার মন খারাপটা খানিকটা হালকা হল।

বিশ মিনিট পর আমরা আনশান পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছালাম। যদিও এটাকে পাহাড় বলে, উচ্চতা বড় জোর কয়েক ডজন মিটার, শহর থেকে অনেক দূরে—সাধারণত দু-একজন সন্ন্যাসী ছাড়া এখানে কেউ আসে না।

‘‘ভাই, তোমার বাকিটা টাকা,’’ ড্রাইভার ফেরত দিল।

আমি টাকা নিতে নিতে দৃষ্টি রাখলাম পাহাড়ের চূড়ায়। ট্যাক্সি চলে যেতেই চেন চেন-কে বার্তা পাঠালাম। সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর এল—‘‘উপরে এসো, আমি পাহাড়ের ওপর।’’

মোবাইল পকেটে রেখে গভীর শ্বাস নিয়ে ঊর্ধ্বমুখী ছুটলাম। কে জানে, মনেই হচ্ছিল মন্দির আর পাহাড়টা অদ্ভুত রহস্যে ঘেরা। যত উপরে উঠি, তত ঠান্ডা বাড়ে, মনে হচ্ছিল যেন তুষারপাতের দেশ।

আজ রাতে ঠিক মেঘলা আকাশ, চাঁদের আলোর রেখা নেই, তাই আঁধারে হাতড়ে হাতড়ে চলতে হচ্ছিল। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলতাম, ‘‘মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালালাম না কারণ বড়রা বলেন, এতে চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয়, ভূত সহজে ভর করে।’’

কষ্টেসৃষ্টে পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছালাম, মন্দির ঠিক সামনে বিশ মিটার দূরে। ফটক ভাঙাচোরা, কোথাও কোথাও সাদা হাতের ছাপ যেন আবছা দেখা যায়।

হাওয়া বয়ে গিয়ে ঘণ্টায় দুলছে, পুরনো ঘণ্টার শব্দে বাতাস ভারী হয়ে উঠছে—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত, ভয়াল পরিবেশ।

নরম গলায় ডাকলাম, ‘‘চেন চেন?’’ কোনো সাড়া নেই।

মোবাইল বের করে ফোন করতে যাচ্ছি, হঠাৎ কেউ কাঁধে হাত রাখতেই আঁতকে উঠলাম, ঘুরে ফোনটা ছুঁড়ে মারতে যাব, তখনই শুনলাম, ‘‘আমি, আমি।’’

হাতটা শক্ত করে চেপে ধরেছি, সামনে তাকিয়ে দেখি চেন চেন। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

‘‘তুমি আমাকে ভয়েই মেরে ফেলতে!’’, হাঁটু গেড়ে বসে দম নিলাম।

‘‘চলো, কাজে আসি,’’ চেন চেন হঠাৎ গম্ভীর স্বরে বলল, ‘‘সম্প্রতি এখানে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, রাত হলে মন্দিরে অদ্ভুত শব্দ হয়, সন্ন্যাসী ছাড়া কেউ আসে না, তাই ভাবলাম একবার দেখে যাই।’’

আমি মাথা নেড়ে মন্দিরের দিকে তাকালাম, মনে মনে ভাবলাম, ‘‘আহা, চেন চেনও ঠিক সময়টায় বোকা হয়ে যায়। এখানে এসে কী করবে, যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে তো নিজেই মরবে!’’