৭৬তম অধ্যায় বিশৃঙ্খল টোকিও

আমি টোকিওতে নগরকাহিনির রহস্যময় গল্প সৃষ্টি করছি। দুই চার শত তেহাত্তর 2901শব্দ 2026-03-20 07:44:14

এইবারের ঘটনা শুধুমাত্র নীহোন জাতির ব্যাপার নয়। উইলিয়াম ওয়ালেসের মৃত্যুর ফলে বাতিঘর দেশের সৈন্যরা প্রচণ্ড ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে ওঠে। টোকিওর নিকটতম বাতিঘর সামরিক ঘাঁটি থেকে বিপুল সংখ্যক সৈন্য অগ্রসর হয়। নীহোনের আত্মরক্ষা বাহিনী ঢুকে পড়ে টোকিও শহরে। নীহোনের সাধারণ মানুষদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। বাতিঘরে নিযুক্ত সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তাসহ শীর্ষ সেনা কর্মকর্তারা নিহত হন।

এই সমস্ত ঘটনা সেনাবাহিনী নামক দানবকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণহীন করে তোলে। কিন্তু শত্রু কোথায়? কেউ জানে না। শত্রুর সংখ্যা কত? কেউ জানে না। এমনকি, শত্রু আসলে কে, তাও কেউ জানে না। সারা টোকিওজুড়ে টহলরত সৈন্য ও পুলিশ ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তাদের শত্রু কোনো সংগঠিত বাহিনী নয়। বরং তারা হচ্ছে সেই উন্মাদ, যারা যেকোনো সময়, যেকোনো জায়গা থেকে হঠাৎ বেরিয়ে আসতে পারে। তারা নির্ভয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে, শুধু মাত্র কুয়াশার রাজাকে বন্দনা করার জন্য। কুয়াশার রাজার বাণী ছড়ানোর জন্য। তাদের রক্ত সবুজ। অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কাগজের পাখির মতো ভেঙে যায়। ‘তোমার হৃদয় উৎসর্গ করো।’

গান ছড়িয়ে পড়ে টোকিওর সর্বত্র। পাহারাদার পুলিশ, সৈন্যরা যে কোনো সময় আকস্মিক হামলার মুখোমুখি হতে পারে। হয়তো তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া কোনো পথচারীর দেহ হঠাৎ বিকট বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে। হয়তো কেউ হঠাৎ ক্ষিপ্ত কুকুরের মতো ছিঁড়ে খাবে। অথবা কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই বিদ্রোহ শুরু হবে। এই ধারাবাহিক অস্থিরতার মধ্যে, যে কেউ সন্দেহজনক মনে হলেই সৈন্যদের গুলির মুখে পড়বে।

সময় গড়াতে থাকে। সূর্য অস্ত যায়। পাতলা কুয়াশা ছড়িয়ে পড়ে টোকিও নগরীতে, তার উজ্জ্বল রঙিন রাতকে নিস্তেজ করে দেয়। দিনের বেলা সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা এই শহরকে আগেভাগেই নিস্তব্ধ করে দেয়। সবসময় অতিরিক্ত কাজকে আপন কর্তব্য মনে করা কর্মীরা তাড়িয়ে দেওয়া হয় কাজের স্থান থেকে। বিনোদন কেন্দ্রগুলো চটজলদি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু... এতে কি কাজ হবে? বাড়িতে লুকিয়ে থাকলেই কি কুয়াশার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে?

ফাঁকা টোকিও মেট্রোর তিন নম্বর লাইনে, মাথা ট্রেনের দেয়ালে ঠেকিয়ে রেখেছিলেন সাকামতো রিউনোসুকে। হঠাৎ তিনি ছিটকে পড়ে আসনজুড়ে পড়ে যান। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখেন, ট্রেনের ভেতর এখন সম্পূর্ণ ফাঁকা। কেবল ট্রেন চলার মৃদু শব্দ তার কানে আসে। ‘আমি কখন ঘুমিয়েছিলাম?’ পাশে স্ক্রিনে গন্তব্যের পথনির্দেশ দেখেন। সেখানে লেখা এক অপরিচিত নাম—সানকাওয়া। সেটা কোথায়? তিন নম্বর লাইনে কি এই স্টেশন আছে?

ভাবতে ভাবতেই ট্রেন থামে। জনতার ঢল প্রবল বেগে ছুটে এসে মুহূর্তে কামরা পূর্ণ করে দেয়। সেই প্রবল স্রোতের মুখে সাকামতো রিউনোসুকে বেরিয়ে যাওয়ার কোনো উপায় থাকে না। ট্রেন আবার ছেড়ে দেয়। কেউ একজন তার পাশে বসে।

একদম পচা টক গন্ধ ভরে ওঠে সাকামতো রিউনোসুকে’র নাকে। তিনি নাক চেপে ধরেন, পাশে তাকান। সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্ক তার মুখে ছেয়ে যায়। তার পাশের জনটি মানুষ নয়—একটি মোটামুটি মানুষের মতো মাংসপিণ্ড। তার মাথা চ্যাপ্টা, স্পষ্টই গাড়ির চাকার দাগ বসে আছে। শুধু সে-ই নয়, চারপাশে তাকিয়ে অবাক হয়ে দেখেন, ট্রেনে উপস্থিত সবাই যেন কোনো দুর্ঘটনার পর ছিন্নভিন্ন লাশ। কিন্তু তাদের সঙ্গে সাধারণ লাশের তফাৎ এই—এরা সবাই এখনো চলাফেরা করছে।

একটু থামুন... তারা যদি সবাই মৃত হয়, সে নিজে? এই ট্রেনে সে কেন? নিজের দেহ পরীক্ষা করে দেখে, দেহে কোনো আঘাত নেই বলে স্বস্তি পায়। কিন্তু খুব শিগগিরই খেয়াল হয়, আনন্দটা বেশি আগেই হচ্ছে। ত্বক ছিঁড়ে গেছে, রক্ত-মাংস ছিটকে পড়ছে, ভাঙা হাড় শরীর থেকে বেরিয়ে আছে। মেট্রোর আসনে বসা সাকামতো রিউনোসুকে ধীরে ধীরে কুয়াশার মতো অচেনা রক্তমাংসের স্তূপে পরিণত হয়।

আঁধার ভেতর সে শুনতে পায়, কেউ চিৎকার করছে—‘কেউ সুড়ঙ্গে ঝাঁপ দিয়েছে!’ ‘মানুষ মারা গেছে!’ দূর থেকে সাইরেনের শব্দ ভেসে আসে। তারা কি তাকে নিয়েই বলছে?

এক তীব্র শব্দের পরে, সাকামতো রিউনোসুকে’র শেষ চেতনা দেখে সামনে ছুটে আসা একটি দ্রুতগামী মেট্রো ট্রেন।

সেই রাতের টোকিওতে কেউ রাস্তার পাশে বিশাল টাকার বান্ডিল কুড়িয়ে পায়। কেউ পিছনে পায়ের শব্দ শুনতে পায়। কেউ দেখে, রাতের অন্ধকারে লাল জামা পরা ছোট্ট মেয়ে হেঁটে যাচ্ছে। কেউ বন্ধুদের ডাকে যোগ দেয়, আটজন খেলোয়াড় প্রয়োজন এমন এক ভয়ানক খেলায়। যে কুয়াশা আসার কথা, যে কুয়াশা না আসার কথা সবই শহরজুড়ে ঘন কালো কুয়াশার মধ্যে হাজির।

কুয়াশার নাম—বিকট রাজার কাহিনি। বর্তমান নিহত—১৫৭৮। নতুন সংক্রমিত—৭৪৪৮১২। মোট সংক্রমিত—৭৪৪৮১২। কুয়াশার স্তর—৫।

একটি সামরিক যান কুয়াশার ভেতর পথ হারিয়ে ফেলে। ইঞ্জিন হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেলে গাড়িটি থেমে যায়। কয়েকজন বাতিঘর সৈন্য বিরক্ত হয়ে গাড়ি থেকে নেমে, সমস্যার কারণ খুঁজতে থাকে। হঠাৎ একজন সৈন্য দেখতে পায়, তাদের সামনে দিয়ে একটি ছোট মেয়ে হেঁটে যাচ্ছে। মেয়েটির চেহারা শান্ত। সে পরে আছে নীহোন উচ্চবিদ্যালয়ের পোশাক। অথচ তখন রাত নয়টার বেশি।

রাতে একা রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোটি বেশ অস্বাভাবিক। কিন্তু সৈন্যরা এসব নিয়ে ভাবে না। মেয়েটিকে দেখিয়ে একজন সঙ্গীকে কনুই দিয়ে ঠেলা দেয়—‘একটা মেয়ে।’ বিরক্ত সঙ্গী প্রথমে মনোযোগ দিতে চায় না, তবে কথাটা শুনে উৎসাহিত হয়ে ওঠে। রাতের শহরে একা হেঁটে চলা মেয়েটিকে সৈন্যরা ঘিরে ফেলে।

‘ছোট্ট মেয়ে, কোথায় যাবে?’
‘রাতে বাইরে ঘুরো না, খুব বিপজ্জনক।’
‘চলো আমাদের গাড়িতে ওঠো, এখনকার টোকিও খুবই ভয়ানক, সকাল হলে তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দেব।’

বলতে বলতেই তারা হাত বাড়িয়ে মেয়েটির গায়ে হাত দেয়। তারা গোল হয়ে ঘিরে ফেলে, পালানোর কোনো উপায়ই রাখে না।

‘না... দয়া করে...’
বাতিঘর সৈন্যদের উত্যক্ততায় মেয়েটি সলিল চিৎকারে কুঁকড়ে গিয়ে মাটিতে বসে পড়ে।

‘না, আমি অনুরোধ করছি আমাকে ছেড়ে দিন!’
‘হা হা, ছোটো, আমরা তো তোমার নিরাপত্তার জন্যই এটা করছি।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, চলো গাড়িতে ওঠো!’

কেউ টেনে ধরে, কেউ আবার নিজের বেল্ট খুলতে শুরু করে।

‘না... দয়া করে...’
ছোট্ট মেয়ে বলির পাঁঠার মতো কাঁপতে থাকে।

‘ভালো মেয়ে, কথা শুনো।’
‘আঙ্কেল তোমায় দুধ খাওয়াবে।’
‘না...!’
‘দয়া করে না!’

হঠাৎ ছোট মেয়েটির দেহ ফেটে যায়। ছিন্নভিন্ন মাংসপিণ্ড থেকে অসংখ্য শুঁড় বেরিয়ে আসে, বাতিঘর সৈন্যদের গায়ে পেঁচিয়ে ধরে, ছিঁড়ে ফেলে। চারিদিকে রক্ত ছড়িয়ে পড়ে। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় সৈন্যদের চিৎকারে আকাশ ফেটে যায়।

‘আমাকে হত্যা কোর না!’
‘তুমি শয়তান, তুমি শয়তান!’
‘হে ঈশ্বর, তোমার বিশ্বস্ত ভেড়াদের রক্ষা করো!’

তারা প্রতিরোধের চেষ্টা করে। ট্রিগার টিপে, আগুনের ঝলকানি, খোসা মাটিতে পড়ে। কিন্তু, সবই বৃথা। প্রথম আক্রমণে যারা মরেনি, তারা বাঁচার জন্য সব কিছু চেষ্টা করে, প্রাণভিক্ষার অজস্র কথা বলে। তবু সেই রক্তপিণ্ড দানব ধীরে ধীরে তাদের নিজের গায়ে টেনে নেয়। তাদের গিলে খেয়ে ফেলে নিজের কেন্দ্রীয় মুখে।

চিবানোর শব্দ ছাড়া সেখানে আর কিছুই শোনা যায় না।